March 17, 2022

গ,ল, ও একটা প

 


-   না না রথীদা , একদম মানা  আজ শুনবই না, তুমি তো জানো আমি কী প্রচন্ড জেদি।

-   আরে সমীর ,আচ্ছা মুশকিলে ফেলেছো,আমার থেকে কতো সিনিয়র লেখক রয়েছেন ? কী করতে কী হবে,তোমার মুখ লুকানোর জায়গা থাকবেনা তখন।

-   আমার মুখের দায়ভার আমার রথীদা,তুমি শুধু তোমার মুখমন্ডল আমার পেজে দেখাও একটিবার । আরে, তুমি হলে আমাদের এই ক্ষুদ্র লেখা-লেখির  গ্যালাক্সির উজ্জ্বল সুপার নোভা। এই সময়ের অসমের একটা সাহিত্য আসর হয় বলো যেখানে তোমার লেখার কথা ওঠে না? তুমি ছাড়া আমার এই অনলাইন লাইভ প্রোগ্রাম কে শুভারম্ভ  করবে? আমি এড দিয়ে দিয়েছি অলরেডি,কতো লাইক আর কমেন্টের বন্যা কি বলবো !

-   সুপার নোভা? জানো তো সুপার নোভা কেন এত উজ্জ্বল হয়? ফেটে মৃত্যুর অটল আঁধারে ডুববে বলে,অনেকটা পিদিমের তেল বিহীন সলতে। তা যখন বলেই ফেলেছো,তোমাকে আর বিপদে কি করে ফেলি?তবে বলিয়া ফেলো সখা কী মোর  করণীয়? কোন রাজদন্ড ভাবিয়া রাখিয়াছ ?

-   ধুস, অতো কিছু না। তুমি লাইভ আসবে, আড্ডা ছলে গল্প নিয়ে দু চার কথা,কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর এবং অবশ্যই এই লক-ডাউন সম্পর্কিত কোন ছোট বা মাঝারী গল্প পাঠ। আসলে আমরা এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে লোকেদের বোঝাতে চাইছি ঘরে থেকেও মনকে কতটা ক্রিয়েটিভ রাখা যায়।

-   আমার আর ঘরে থাকা, জানো তো ব্যাংকের কর্মীর কী লক-ডাউন? প্রতি একদিন অন্তর যাচ্ছি। এখন মনে হচ্ছে বড় ব্রাঞ্চে থাকলে ভাল হতো ,দু দিন করে ছুটি পাওয়া যেতো।

-   ও তুমি কলম ছুঁলেই লেখা। তবে দেখা হবে। আজ রাত ৯ টায় , অপেক্ষায় থাকবো।

 

            সকালের কথাগুলো আবার মনে পড়লো রথীজিতের। সমীর বরাবর এমন খামখেয়ালী, অথচ ছেলেটার এমন অদ্ভুত মায়া মানা করা যায় না। কিন্তু সমীর কে বলা হয়নি এই লক-ডাউনে সাহিত্যিক রথীজিৎ মুখার্জী কোনো করোনা নিয়ে লেখা লেখে নি। সে এ কয়দিন ডুব দিয়েছে তার ছোটবেলার স্মৃতি, সেই আধ শহুরে গ্রামে। রথী বরাবর এই সিক্রেসি মেন্টেন করে, শেষ হওয়ার আগে কাউকে কিচ্ছুটি জানানো চলবে না। আজ একখানা গল্প লিখতেই হবে রাত ৯টার আগে, সকলকে তাক  লাগিয়ে দেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করা যায়?

 

            রথী এই অল্প বয়সে নামযশ আসলে প্রচন্ড উপভোগ করে। সমীর আগেই বলেছিল একটা ফেসবুক লাইভ করবে, জানতো ওর ডাক আসবে,কিন্তু একেবারে ওপেনিংএ ডাকা বাড়াবাড়ি করে ফেললো । অবশ্য, এখন মুখ দেখলে যে কেউ পড়ে ফেলবে যে এই বাড়াবাড়ি রথীর কাছে কতটা সুখকর। লক-ডাউন নিয়ে একটা হট কেক বেইক করা কি মুখের কথা ? দু একজন টাইপ করে নিজের পেজে দেবে, তারপর কতো কতো শেয়ার, বাচিক শিল্পীরা  রেকর্ড করবেন ,কেউ কেউ ফটো জুড়বেন ইন্টারনেট থেকে, লাইক আর কমমেন্টস ভীড় করে আসবে স্ক্রীনে ।

 

বেশ মাখো মাখো একটা প্রেমের গল্প লিখে ফেলা যাক? স্বামী স্ত্রী অনেক দিন পর কাছাকাছি বহুক্ষণ , টান মনের, টান শরীরের।  বিছানায় অনেক দিন পর চেনা সুবাস,একটু অগোছালো ঘর,রান্নাঘরে দু এক ব্যঞ্জন কম। স্বামীর ফোনে পরকীয়া রিংটোনে আজ শুধুই মিসডকল।

 

না। মোটেই জমবে না, তার উপর সর্বাণী যদি বুঝে যায়,তাহলে আরেক ঝামেলা। কাগজ ছিঁড়ে, ডাস্টবিনে তাক করে,  কেরামের গুটি পকেটে মারার শট দিল রথী।

 

তার চাইতে বিচ্ছেদ ভালো । কতো দিন দেখিনি ভালোবাসা তোমায় , শুধু ইন্দ্রজালের সবুজ আলো বলে তুমি আছো,কাছেই আছো। তোমার ঠোঁট আজকাল প্রায়েই স্বপ্নে ভেসে আসে। শুধু ঠোঁট দুটো- নরম, গোলাপী,হালকা নড়ছে । আমি প্রাণপনে চিৎকার করে বলি,- ঐ দুটো ঠোঁট আমার অতি পরিচিত,কতো শ্রাবণ বসন্তে শুষেছি সব ঘাম, প্রেমের বৃষ্টিবিন্দু। অথচ ওরা কথা বোঝে না, শুধু প্রমাণপত্র চায়, তুমি কি আমাকে সীলমোহর দিবে?

 

আজ এই সব কি লিখছে? মনে হচ্ছে কেউ যেন চেলেঞ্জ করেছে ঐ ১০ শব্দ বা ২০, ৫০ ,যাকিছু। এরপর এখন আরো কয়েকজনকে ট্যাগানোর পালা। এভাবে লিখতে আর কাটতে থাকলে এই লেটার প্যাড একটি গল্পেই অক্কা পাবে। আসলে গল্প লেখার থেকে মুনশিয়ানা হলো টপিক। আজকাল সোশাল নেটওয়ার্কিং এ এতো  এতো লেখা, এত এত টপিক। আলাদা নাহলে লোকে দুটো লাইন পড়েই হওয়া। তবে যাবার আগে,লাইকের মহিমা ঘোষণায় ভুল হয় না। রথী যুদ্ধ জয়ের আশায় মন প্রস্তুত করে ফেলেছে। দুঃখের গল্প লেখা হবে,পাঠক এই পারফর্মিং আর্ট বা লিটারেচারে দুঃখটা খায় ভাল। এটা ভাবার সাথেই হঠাৎ ওসব রিয়্যালিটি শো নামক চলা অত্যাচারে সাজানো মেকি কান্না ও তার তরতর করে বেড়ে যাওয়া টিআরপি মনে এলো রথীর, মুখে এলো বাঁকা চাঁদের হাসি।

 

            এ কয়দিন ফেসবুকে বেশ কিছু ফটো চোখে পড়েছে, একটা দুটো বাস আর ভিড় করে আসা  শ্রমিকদল, ঠান্ডা পড়লে পরিযায়ী পাখির এভাবেই দেখা মেলে দীপরবিল জুড়ে। ফেভিকল কোম্পানী বহুযুগ আগেই এই চিত্র নিয়ে এড বানিয়েছিল । এই বাস কিছু সৌভাগ্যবান কে বুকে পুড়ে পারি  দেয়  যথা সময়,বাকি অকুল সমুদ্রে। হয় সাঁতরে পার হতে হবে, নাহলে গলায় কলসী বাঁধার রশি তৈরি করতে হবে। অবাক করে দিয়ে এই সব মাটি মানুষের দল এক হাত দিয়ে সাঁতার কাটে,এক হাতে দড়ি বানায়। আমরা সকলে মিলে গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস উপভোগ করি,পপকর্ণ সহযোগে।

-   বাবু একডা কথা আসিলো

যাঃ ,সবে শুরু হলো লেখা আর বাধা। এই বাধায় আজ জড়াবে না বলেই রথীর জোর করে কাস্টমার  গ্রিভেন্সে বসা। কাস্টমারপ্রায় নেই বললেই চলে,গ্রিভেন্স আসবে কোথা থেকে?

-   কি?হইসে কি?

এক সুর মিলিয়ে মুখে ২ কেজি উচ্ছের রস ঢেলে জিজ্ঞেস করল রথী।

-   বাবু ৫০০ টেকা পাইসি।

-   তো নাচো ,আমি কি করবো ?

-   না, মানে, ওই  খাতাটা আসলে মায়ের নামে। আমি রতন মণ্ডল,মা সরলা মণ্ডল। বাবু, ওই খাসায় (খাঁচায়) বওয়া বাবুয়ে কয় মা সাপ (ছাপ ) মারলে টেকা দিব ।

-   তো টাকা তোর মা পেয়েছে,তো তোকে দিতে যাবে কোন দুঃখে ? খালি মায়ের টাকা মেরে মাল খাওয়ার মতলব।

-   না বাবু না, মা বুড়া হইসে। আমি এতো দূর হাইট্টা আইসি, মা কেমনে আইবো কন ?ঘরে খাবার নাই ,বাইরে কাম নাই। ওই  টেকাটা  দিয়া দেন না বাবু ।

-   আমার মুখে কি লেখা বোকা বলে? ঐ টাকা ঐখানেই থাকবে রে,উড়ে যাবে না। যা,কাল মাকে নিয়ে আসবি। ব্যাংকের একটা নিয়ম থাকে তো না কি?

রতন মাথা নিচু করে চলে গেলো। রতনের চলে যাওয়া ছায়াশরীরের দিকে তাকিয়ে রথী মনে মনে ভাবলো এটা গল্প হলে, আর ও নায়ক হলে নিশ্চয়ই নিজের পকেট থেকে ১০০ টাকা দিয়ে বলত, “যাও, কাল মাকে কিছু ভাড়া করে নিয়ে এসো।”

যাক আমাদের দুঃখের  গল্প যেন কোথায় ছিল? হা , শ্রমিকেরা শুরু করল পদযাত্রা। আমাদের গল্পের নায়ক ও তাদের একজন ,নাম কি দেওয়া যায়? রতন মণ্ডল? আচ্ছা সেটাই থাক। না একটা মদ্দা  ছেলে হলে শুধু জমবে না, ওর পরিবারও সাথে চলছে হেঁটে, বউ ও দুটো কচি বাচ্চা,বয়স যা কিছু একটা,কে আর হিসেব রাখছে। রথী মনে মনে সিচুয়েশন কল্পনা করলো। এ কয়দিন ইন্টারনেট ভাসিয়ে দেওয়া কত কত ছবি চোখের সামনে ভাসছে এক এর পর এক। একটা ছবি খুব তোলপাড় করেছিল রথীর মন,ফাটা চার জোড়া পায়ের ছবি, পা ফেটে চামড়া খুলে খুলে পড়ছে। পরে কেউ লিখলো  ওই ছবি এ সময়ের না, পাকিস্তানের। শুনে মনে এক স্বস্তি এসেছিল। স্বস্তি কি পাকিস্তানের,ভারতের নয় বলে? ভারতের এই মজুরদের পায়ের ছবি কোন ক্যামেরাম্যান কি তুলেছে?কেমন পা ওদের? অন্যরকম কিছু?

-   বাবু, একটা কথা জিগানের আসিল?

সবে দুঃখগুলো গ্রে-সেলে  আঘাত দিচ্ছিলো ,আবার বাধা পড়লরথী বিরক্তি সহকারে তাকালো, এক মধ্য বয়স্ক লোক, অনাহারে হয়তো একটু বেশি বুড়িয়ে গেছে মনে হলো, অবশ্য নেশার জেরেও হতেই পারে

-   বাবু, সরকারে বলে গরীব মাইনসেরে ৫০০ টেকা  দিতেসে?

-   হুমম ,তোমার পাসবুক,  মানে ঐ খাতা নিয়ে যাও ঐ ৪ নম্বর কাউন্টারে ,দিয়ে দেবে

-   গেসিলম বাবু, কইলো কি সব একান্ট ফেকান্ট  লাগবো? কই  পায়?

-   বলি কোন জগতে থাকো ?ব্যাংক একাউন্ট যখন বানলো সরকার,ঘুমিয়ে ছিলে ?

-   জানি না বাবু,আমরা তো ঐ ইস্টিশনের পাশে খালি জায়গায় থাকি। ঐখানে কিছু বানাইসিলো নি?চক্ষে তো পরে নাই?

-   গবেট একটা। যাও এইখানে কিছু হবে না। ঐ ৫০০ টাকা সবাই পায় না,তোমার নাম ও নাই, যাও। যাও বলছি ।

লোকটা কি বুঝল বোঝা গেল না, আধময়লা গেঞ্জি দিয়ে চোখ মুছলো কি একবার? হয়তো তাই। রথী বুঝল মেজাজ ঘেটে ঘ।   কেন যে সরকার এসব ঘোষণা করে? আজকাল এই লক-ডাউনে এই হয়েছে কাজ। জনে জনে আসে, একবার দেখবে ৫০০ আছে, একবার তুলবে, একবার বইয়ে লেখবে। মনে হচ্ছে ৫০০ না যেন পঞ্চাশ হাজার।  

না, এসব ফালতু কাজে অনেক মাথা ঘামিয়েছে রথী, সময় নষ্ট অনেক ।ওকে এবার ওর কালজয়ী গল্পে ঢুকে পড়তেই হবে। সকলে শুনবে আর চোখে আসবে জল। রাবীন্দ্রীক কায়দায় বলবে- হায় রে বিধাতার শক্তির অপব্যয় ।

-   হই দিনু ,এক কাপ চা দিয়ে যা,গল্প জমে উঠেছে।


উজান অতিমারি সংখ্যা (সপ্তদশ সংখ্যা ১৪২৮ ), তিনসুকিয়া, অসম এ প্রকাশিত (ডিসেম্বর,২০২১ ) 

September 19, 2020

লাইক- ডিসলাইক

 


আগরতলা, ত্রিপুরা থেকে 'এবং উমিয়াম' ওয়েবজিনে ৩০.০৫.২০২০ প্রকাশিত 

May 21, 2020

আঁচল



-        কী আর করবো? রোজ অংক কষছি আর ভিডিও বানাচ্ছি । এভাবে অনলাইন কি আর পড়ানো যায়? ...
           আরে বাবা পিপিটিও বানিয়েছি। ভাল্লাগেনা এই জ্বালা।...   
আজই তো আরও দু’সপ্তাহ বাড়িয়ে দিলো । এই সেশন এভাবেই যাবে দেখবি।...   
আসলে ভাবছে টিচারদের কেন বেকার টাকা দেবো, একটু খাটিয়ে মারবো না? ...   
চল রাখছি, এখন তো আবার পচার মা মোড অন। মার ঝাড়ু মার ঝাড়ু মেরে ঝেটিয়ে বিদায় কর... 
         
@কমলিকা 
বৌমার টুকরো টুকরো কথাগুলো কানে আসছে সুধাময়ীর। কথাটা অবশ্য মিথ্যে বলেনি। এই গৃহবন্দিনী হওয়ার পর থেকে প্রভা নিজেই ঝাড় -পোঁচ চালাচ্ছে, আর উনি নিয়েছেন রান্নাঘরের দায়ভার। আসলে রাঁধতে সুধা বরাবর ভালোবাসেন। তবে ক'বছর আগে শুভ জোর করলো- মায়ের বয়স বেড়েছে,আর কেন গরমে তেতে পুড়ে সিদ্ধ হওয়া? এরপর ঘরে কুক এলো,ব্যস সুধার হাতে রিটায়ারমেন্ট লেটার। তাছাড়া কুক চাইনিজ, কন্টিনেন্টাল,মেক্সিকান,কত কি জানে? আর সুধা, সেই তো থোড়-বড়ি-খাড়া  আর খাড়া-বড়ি-থোড়। ওসব সেকেলে খাবার গেস্টদের খাওয়ালে কী প্রেস্টিজ থাকে?

এই লক-ডাউনে ঠিক কতজন জ্বালাময় জীবন পেয়েছে সুধা জানেন  না, কিন্তু সে নিজে তুখোড় ভাবে উপভোগ করছেন। শুধু খুশিটা বাইরে প্রকাশ করেন না- এই যা। রোজ সকালে রামকৃষ্ণ দেবের ছবিতে একবার বলেও ফেলছেন, - ঠাকুর রোগ ঠিক করে দাও তবে পারলে এই লক-ডাউন আরও কিছু দিন রেখো,সকলেরই তো একটু ছুটির দরকার।

খুশি হবেন নাই বা কেন? সেই কলেজে পড়ার পর শুভটা আর কখনো এতদিন ঘরে রয়েছে? ছেলে,বৌমা,নাতি সব এখন ঘরে,তাঁর কাছে, এর থেকে আনন্দ আর কি কিছুতে থাকতে পারে? রোজ মনের মতো যা নিরামিষ পদ বানাচ্ছেন , সকলে সোনামুখ  করে খাচ্ছে। টুকাইটা তো কাল জিজ্ঞেস করেই ফেললো ঝিঙে-পোস্ত খেয়ে, - ঠাম ,এই হোয়াইট বলসগুলো কি কোনো ভেজিটেবল?

শুভ মানে শুভপ্রসন্ন  চ্যাটার্জী বিশাল আইটি কোম্পানীর এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার। নামেই  ঘরে আছে, সকাল থেকে রাত কাপের পর কাপ ব্ল্যাক কফি ও ল্যাপটপে মুখ গোঁজা,কানে হেডফোন। জীবনের সেনটেন্সে শুধু লাঞ্চ ,ডিনার,স্নান, ঘুম, ও ব্রেক, এই পাঁচটে অল্পবিরাম,যাকে বলে কমা, সাজানো। স্ত্রী ইন্দুপ্রভা এক ডাকসাইটে স্কুলের  ম্যাথস টীচার। দিন কাটছে অনলাইন ক্লাস ও ইউটিউব, ফেসবুক করে, মাঝে মাঝে দু একটা ভিডিও কল। ছেলে সূর্যপ্রভ মানে টুকাইয়ের বয়স সবে পাঁচ। তার বিশেষ কাজ নেই। কিন্তু বাপী-মামকে শান্তিতে কাজ করতে দেওয়ার জন্যে তাকেও দেওয়া হয়েছে একটা ট্যাব । কার্টুন,গেমস্ ,রাইমস্ ,কি নেই এইটুকুন বাক্সে ? সুধাময়ী দেখেন আর ভাবেন কম্পিউটার চালানো শিখে ফেললে বেশ হত ,উনিও তাদের একজন হয়ে উঠতে পারতেন। স্ক্রিন টাচ মোবাইল বৌমা শিখিয়ে দিয়েছে সত্যি, কিন্তু ছুঁলেই কেন যে ভয় পেয়ে বসে -অত দামী জিনিস, যদি কিছু হয়।

তার চাইতে টিভি ভাল,ঐ বাংলা সিরিয়ালগুলো ভাল। তবে এই একটা জিনিস সুধার একেবারেই ভাল লাগছে না। আজকাল একটা সিরিয়ালও নতুন এপিসোড দেখায় না। সব পুরোনো শেষ হওয়া সিরিয়ালের রেকর্ডিং ক্যাসেটে ধুলো ঝাড়ছে আর চালাচ্ছে। কিন্তু তবুও কিছু পাওয়ার জন্যে কিছু ছাড়া যেতেই পারে। নাহয় তিন তিনটে মুখ যখন ইচ্ছে দেখার জন্যে সুধা ঐ সিরিয়ালগুলোর মায়া ত্যাগ করলেন।

টিং-টং ,টিং-টং

-        এই দুপুরবেলা আবার কে এলো?ভাবলাম একটু রেস্ট নেই, এখন কনফারেন্স নেই, কার  সাধ্য ? আসছি রে বাবা আসছি। মা তুমি কিন্তু আবার দরজা খুলতে চলে যেও না।

সুধার এই কথাতে প্রথম প্রথম একটু মানে লাগতো, এখন গা  সওয়া হয়ে গেছে। এই রোগে বৃদ্ধেরা  না কি বেশি রিস্কে ,তাই আজকাল সুধার দরজা খোলা মানা। যেন সেই ষাটের দশকের ঘর,শুধু জওয়ান পুরুষ দরজা খুলবে,বাকি সব অন্দরে। সুধার মাঝে মাঝে মনে হয় শুভকে বলতে, ওনার আর শুভর ইমিউনিটি টেস্ট হলে উনি জিতবেন,নিশ্চিত। শুভই দু দিন অন্তর হয় জ্বর, নাহলে মাথাব্যাথা, না হলে অন্য কিছু নিয়ে কাড়িকাড়ি ওষুধ গেলে।

-        কে , কী চাই?
-        দাদা, আমি কালু, একটু দরজা খুলেন না,কাম আসিলো।
শুভ দরজা খুললো বটে কিন্তু ল্যাচটা রইলো যথাস্থানে, বলা তো যায় না।
-        কালু মানে, ঐ পাড়ার হরি মুদির দোকানের কালু? তোকে তো চিনতেই পারিনি আমি। এরকম টেরোরিষ্টের মতো পুরো আপাদমস্তক ঢেকে এসেছিস যে। বৌদি বা মাসি কি ফোনে কিছু আনতে বলছিল ?
-        (একটু লজ্জা পেল মনে হলো) কী করুম কন দাদা?সবে কয় মাস্ক পর,কই কই ঘুরস,আমাদের ঘরে এরপর তুই অসুখ ঢুকাবি দেখতেসি। দাদা, একটু মাসিমারে ডাইক্কা দেন না।
-        কেন? আমাকে বল, কী  কাজ?
-        না দাদা, মাসিমারে ডাকেন, একটু দেইকখা যামু গিয়া, দূরে থাকুম বিশ্বাস করেন।

শুভ মনে মনে বেশ বিরক্ত হলো। ইচ্ছে করছে মানা করে দিতে,কিন্তু ওদের এখন হাতেও  রাখতে হবে। ওসব মল, অনলাইন ডেলিভারী সব বন্ধ, এখন এই কালু না করলে শেষ মেশ শুভকেই চলের বস্তা  বইতে হবে। নিশ্চয়ই টাকা চাই। ঠিক বুঝেছে ছোঁড়া যে শুভ অতো সহজে গলবে না,তাই মায়ের খোঁজ। মায়ের  এই বোকা বোকা ভালমানুষী শুভর জাস্ট সহ্য হয় না। গরীব শুনলেই হয়ে গেল, পারলে কোলে বসিয়ে ভাত খাওয়াবে। বোঝানোই যায় না এগুলো এখন অচল, লোকে ফায়দা লুটে, যেমন এখন এই কালু এসেছে। মাকে আচ্ছা করে বলে দিতে হবে ৫০ টাকার বেশি যেন না দেয়। সরকার সব তো দিচ্ছে, এদের স্বভাবটাই হচ্ছে পরের মাগনা  খাওয়া।

-        কি রে কালু,আমার খোঁজ করছিলি ? তুই তো মাসি কে ভুলেই গেছিস, দরজা থেকেই চলে যাস আজকাল।
-        না মাসিমা, সবে কয় বুড়াগো সমলাইয়া থাকতে, তাই ডাকি না। আপনে ভাল থাকেন,  এইটাই তো চাই কন।
-        তা ডাকছিলি কেন সেটা তো বললি না এখনো। কী হয়েছে,হাতে টাকা নাই ? খেয়েছিস কিছু আজকে?
-        না না মাসিমা, আপনেরে দেখতে মন বড় টানতেসিলো, তাই আইলাম। এখন দেখসি , যাই গিয়া।
-        মানে? আমাকে দেখতে? বুঝলাম না। সত্যি বল তো কালু কি হয়েছে।
-        মাসিমা, আপনেরে মিসা কমুনা । আপনেরে কইসিলাম  না গ্রামে আমার মা একলা থাকে, আর আমি এইখানে। মারে আমি এক দিন বাদ দিয়া পরের দিন দুপুর বারোটায় সঞ্জয়দার দুকানে ফোন করতাম। সঞ্জয়দার আমাগো পাড়ায় জামা-কাপড়ের দুকান, অনেক বড়লোক। আমি সঞ্জয়দারে রাজি করসিলাম যে আমি ফোন করুম, মারে একটু কথা কইতে দিব, মাসে ৫০ টেকা দিমু। এখন ২১ দিন ধইরা দুকানও  খুলে না, মায়ে  ফোনও ধরে না। মারে খুব মনে পরতেসিলো। মনে হইলো আপনেরে দেইখা যাই। আপনে যখন ভাল আসেন, মা ও ভালই থাকবো, তাই না কন?

এখন প্রায়ে রাত ১১টা। সুধাময়ীর চোখে ঘুম নেই। দরজা বন্ধ করে যখন আড়ি পাতা শুভকে বলেছিলেন টাকা লাগবেনা,তখন কি তাঁর গলা কাঁপছিল? শুভ তো তার সুযোগ্য ছেলে,সবে তাঁকে রত্নগর্ভা বলে, তবে কেন আজ হিংসে হলো মনে? মায়ের মনে কি আদৌ হিংসে হয়? কি সব ভাবছেন  আকাশ পাতাল আজ। সব ঐ হতচ্ছাড়া সিরিয়ালগুলোর জন্যে। বেশ টাইম পাস হত, এখন সারাটা সন্ধে আলসেমিতে কাটে আর রাতে ঘুম হাওয়া। হাত জোর করে বিড়বিড় করলেন সুধাময়ী – ঠাকুর, সিরিয়ালগুলো শুরু করিয়ে দাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, লক-ডাউন উঠিয়েই দাও, খুব বাজে কাটছে দিনগুলো।



ফেসবুকে পোস্ট ০৩.০৫.২০২০ । 

রিটার্ন জার্নি



সন্ধে থেকে সুচরিতা পায়চারি করেই চলেছে। এর পর নিশ্চয়ই মায়ের মতো হাঁটু ধরে বসে পড়তে হবে। আসলে সমু একবার কল  না করলে, কিছুতেই মনটা শান্ত হবে না। যে মুহূর্তে টিভি স্ক্রীন জুড়ে প্রধানমন্ত্রীর ছবি এলো, সু জানত একটা কিছু ঘটবেই। কিছুদিন ধরেই তো ঘরে-বাইরে কান পাতলে একটাই কথা- দেশের নাম ও মৃতের তালিকা।
@কমলিকা

মন্ত্রী মশাই তো লক-ডাউন বলেই খালাস। এদিকে সমু যে বাইরে রয়েছে,তার কি হবে ? সমু মানে সমীরেন্দ্র সান্যাল, হাসবেন্ড অফ সুচরিতা সান্যাল, ডাকসাইটে কর্পোরেট বডির সেল্স ডিপার্টমেন্টের এগজিকিউটিভ ম্যানেজার। সবসময় হিল্লি- দিল্লী করে বেড়াচ্ছে। আজকাল ঘরে কয়টা দিন থাকে সু হাতে  গুণে বলে দিতে পারবে।

মুরাকামির নতুন কেনা বইতে কিছুতেই মন বসছে না । কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে মনে হলো দার্জিলিং টি নয়, যেন চিরতার রস খাচ্ছে ছোটবেলার মতো।

-   মালতী, এই মালতী, চায়ের কাপ নিয়ে যা , খাব না।

সমানে মোবাইল অনরিচেবল বলছে। নিশ্চয়ই কোনো  মিটিংয়ে ব্যস্ত। কতবার সু বলেছে ফোন চালু রেখে সাইলেন্ট মোড দিলেই তো হয়,কে শোনে কার কথা?

রিংটোনের রবীন্দ্রসংগীত যেন রাতের  এই বাংলোর মোহময় স্তব্ধতাকে বাতিল কাগজের মতো ছরররর শব্দে ছিড়ে দিল।

-   হ্যালো সু, শুনতে পারছ ? খবরটা পেয়েছো ?
-   পেয়েই তো তোমাকে কল করেই চলেছি । ২১ দিনের লক-ডাউন ডিক্লেয়ার হলো যে,কি করবে কিছু ভাবলে?
-   আমি আর ফিরতে পারছিনা ঘরে এখন। এয়ার ,রেল বা রোড ওয়েজ , পুরো বন্ধ। এত চিন্তা হচ্ছে তোমার জন্যে, কি করবে যে একা একা।
-   কি যে বলো ? আমার তো উল্টো তোমার জন্যে হচ্ছে। এখানে তো বলরাম ও মালতী আছেই। তুমি ওখানে থাকতে পারবে তো ?
-   এখানে সুপার ব্যবস্থা, নো চিন্তা। আসলে সি.ই.ও সাহেব সহ অনেকে টপ অফিসিয়াল এখানে আটকে পড়েছেন, এখন যদি ছেড়ে নিজের ঘরে ফিরে আসা নিয়ে ভাবি, সকলেই আনকালচার্ড  ভাববেন। তবে আমি তোমায় মাঝে মাঝে কল করে খবর নেব। নিজের খেয়াল রেখো। রাখছি সু, লাভ ইউ।
-   লাভ ইউ টু, টেক কেয়ার।

এতক্ষণে সু হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। বাপরে, ২১ দিন ও আর সমু এক ছাদের তলায় চব্বিশ ঘণ্টা ভেবেই কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আসলে একাকীত্বের এক নিজস্ব স্বাদ রয়েছে। একবার এই স্বাদ জিভে ঠেকে  গেলে,খুব ঝামেলা। এখন ১-২ দিনেই সু-র অস্বস্তি হয়, মনে হয় যেন বিছানা, ঘর, স্বাধীনতা- সবেতে কে যেন ভাগ বসাচ্ছে।

মুরাকামী আবার হতে ফিরে এসেছে। ভাগগিস লক-ডাউন ১০ বছর আগে হয়নি । তখন তো সু নতুন বউ, তখন সু স্বামী হ্যাংলা,তখন সু বড্ড বোকা।

তখন কি সমুও তেমন বোকা ছিল? বলতো, এ সময় বাইরে যাবই না, চাকরি যাক গোল্লায়,যদি আটকে পড়ি , কিভাবে থাকবো তোমাকে ছাড়া? হয়তো বলতো , হয়তো বা না।

বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে লেখা, “থিংস আর নট হোয়াট দে সীম”। সু বইয়ের ভেতর  ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। রাত বাড়ছে নিজের খেয়ালে, বেড়েই চলেছে।



ফেসবুক পেজে প্রথম গল্পটি পোস্ট করি ২৬.০৪.২০২০। সেই সুত্রে এটি আমার লেখা প্রথম প্রকাশিত গল্প।  

More to see...